কলকাতার সাধবী তেরেজা
(আগ্নেস গন্ জা
বোইয়াজিউ)
২৬.৮.১৯১০-৫.৯.১৯৯৭
মাদার তেরেজার
জন্ম হয়েছিল ১৯১০ খ্রীস্টাব্দের ২৬ আগষ্ট তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী মাসিডোনিয়ার
বর্তমান রাজধানী স্কপিয়ে শহরে । তার বাবা-মায়ের
নাম ছিলো নিকোলা ও দ্রানা বোইয়াজিউ । তাঁদের আদি নিবাস ছিলো আলবেনিয়া এবং তাঁরা
কাথলিক ধর্মবিশ্বাসে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ছিলেন । জন্মের পরদিনই তাকে দীক্ষাস্নান
দেওয়া হয় এবং তার নাম রাখা হয় গন্ জা আগ্নেস । আলবেনিয়া ভাষায় গন্ জা কথাটির অর্থ ‘ফুলের
কলি বা মুকূল’ । মা-বাবার পাঁচ সন্তানের মধ্যে
সে ছিলো সবার ছোট । এ সময় তার জ্যেষ্ঠ বোন আগা’র বয়স ছিলো সাত বছর এবং ভাইয়ের বয়স
ছিল দুই । অন্য দুই সন্তান শৈশবেই মারা যায় ।
বোইয়াজিউ পরিবারে
ছেলেমেয়েদের জীবনযাত্রা বেশ ভালোই চলছিল । তাঁদের বাবা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ।
বাড়ীর অদূরে তাঁর একটি দোকান ছিল । তিনি নগর পরিষদের একজন সম্মানিত সদস্যও ছিলেন ।
তাঁদের মা ছিলেন অত্যন্ত স্নেহবৎসল, তাই আদরের সুরে তাঁর সন্তানেরা তাঁকে “নানে
লোকে” বলে ডাকত, আলবেনিয় ভাষায় যার অর্থ ‘আমার প্রাণের মা’ । তিনি আসলে বোইয়াজিউ
পরিবারে প্রাণস্বরূপ ছিলেন । এই ভক্তিপ্রাণ নারী তাঁর সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই
ঈশ্বরেকে জানতে ও তাঁকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন । তাঁর কাছে তাঁরা শিখেছিলেন কীভাবে
প্রতিবেশীকে ভালোবাসতে হয় । তাঁর কাছে সাহায্য চাইলে তিনি কখনো কাউকে খালি হাতে ফিরিয়ে
দিতেন না । ‘নানে লোকে’ তাঁর সন্তানদের কড়া শাসনে রাখতেন কারণ তিনি তাঁদের
ভালোবাসতেন । তিনি চেয়েছিলেন তাঁরা যেন ভালো মানুষ হয় এবং ন্যায়পথে চলতে শেখে ।
তিনি তাঁদের অপরের সম্বন্ধে খারাপ কিছু বলতে দিতেন না । তিনি তাঁদের শিখিয়েছিলেন
সময় নষ্ট করে জিনিসপত্র অপচয় না করে কখনো মিথ্যা না বলে তাঁরা যেন সযত্নে ভাল
বন্ধু বেছে নেয় ।
গন্ জার বয়স যখন
সবেমাত্র ৯ বছর, তখন আকস্মিক ভাবে তাঁর বাবা মারা যান । ইতিপূর্বে পরিবারের কেউ
কখনো এত কষ্ট ও দুঃখ পায়নি । এর পরের মাস ও বছরগুলো তাঁর মায়ের পক্ষে খুব কষ্টের
ছিল । অনেক কষ্ট করে তাঁর ছেলেমেয়েদের খাদ্য বস্ত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয়
জিনিসপত্র জোগাড় করতে হয়েছিল এবং তাঁদের স্কুলে পড়াতে হয়েছিল । সন্তানদের
ভরণপোষণের ব্যয় নির্বাহের জন্য তিনি একটি ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করলেন । সূচ দিয়ে
কাপড়ে নক্সা তৈরি করে তিনি সেগুলো বিক্রি করতেন । কর্মদক্ষতা ও পরিশ্রমের ফলে তিনি
প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার টাকা উপার্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন । তিনি কঠিন
সময় পার হওয়ার মধ্যে দিয়ে তাঁর সংগে তিনটি সন্তানদের এবং তাঁদের ভাইবোনদের
পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক অধিকতর ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলো । এভাবে তাঁদের পরিবার প্রকৃত সুখি
পরিবার হয়ে উঠলো ।
গন্ জা ছিলেন বেশ
সুন্দরী ও প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর । একই সঙ্গে
তিনি ছিলেন পড়ুয়া ও কঠোর পরিশ্রমী । তিনি বিশেষভাবে বই পড়তে, গান গাইতে ও
অভিনয় করতে পছন্দ করতেন । গন্ জা ও তাঁর বোন আগা (যীশুর) পবিত্র হৃদয় গির্জার গায়কদলের মধ্যে প্রধান ভূমিকা পালন করতেন ।
প্রায় প্রতিদিন গনজা তাঁর মায়ের সাথে গির্জায় যেতেন প্রার্থনা করতে । ঈশ্বরের
প্রতি তাঁর ভালবাসা ক্রমেই গাভীর থেকে গভীরতর হতে লাগলো । তিনি মনেপ্রাণে চাইতেন
যেন সবার মধ্যেই ঈশ্বরের প্রতি অনুরুপ ভালবাসা স্থান পায় এবং তারফলে তাঁরা যেন
তারই মতো সুখী হতে পারে ।
তাঁর বয়স যখন
বারো বছর তখন গন্ জা প্রথম তাঁর হৃদয়
গভীরে ঈশ্বরকে অনুসরণ করার ডাক শুনতে পেলেন । অনেক বছর পরে লোকদের প্রশ্নের উত্তরে
তিনি বলেছিলেন –“আমি জানতাম আমি গরীবদের কছে যাওয়ার আহ্বান পেয়েছি । আমি মিশনদেশে
প্রেরণকর্মী হতে চেয়েছি । মিশনদেশে গিয়ে আমি মানুষের কাছে খ্রীষ্টের জীবন বিলাতে
চেয়েছি ।” তাঁর বয়স যখন আঠারো বছর পূর্ণ
হলো, তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, ঈশ্বর
তাঁর কাছে যা দাবি করেছেন তা করার এখনই উপযুক্ত সময় । তিনি ধন্যা কুমারী মারীয়া
(লরেটো সিস্টার) সংঘে যোগদানের আবেদন জানিয়ে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন । তাঁর এই সঙ্গে বেছে নেওয়ার পেছনে যুক্তি ছিল এই যে
এই সংগের সিস্টারগণ ভারতে প্রেরণকাজ করতেন । কিন্তু তাঁর মাকে ছেড়ে দূরদেশে চলে
যাওয়া তাঁর পক্ষে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ছিল,
কেননা তাঁকে তিনি অন্তর দিয়ে ভালবাসতেন এবং তিনি তাঁর অত্যন্ত আপনজন ছিলেন । তাঁর
মা তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন – “তোমার হাত তাঁর (যীশুর) হাতে রেখে তাঁর সাথে সাথে চলো
। কখনও পিছনে ফিরে তাকিও না ।” ১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে রেলস্টেশনে
চোখের জল মুছতে মুছতে বিদায় নিয়ে সাহসের সঙ্গে তিনি আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে অবস্থিত
রাথফার্নহাম মঠের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন । সেখানে দু মাস থেকে তিনি ইংরেজী
ভাষা শিখলেন । সেখানে তাঁকে নতুন নাম দেওয়া হলো “ সিস্টার তেরেজা”। তিনি যে নতুন জীবন শুরু করলেন তারই
প্রতীকস্বরূপ তাঁকে এই নাম দেওয়া হলো । নিজের পরিবার –পরিজনকে ছেড়ে এসে নতুন দেশে
এই নতুন জীবন শুরু করা মোটেই সহজ সাধ্য ছিল না , তথাপি সিস্টার তেরেজা তাঁর হৃদয়ে
তীব্র আনন্দ ও প্রশান্তি অনুভব করলেন ।
আয়ারল্যান্ড থেকে
আরও তিনজন যুবতী সিস্টারের সাথে তিনি জাহাজে চড়ে বাংলাদেশে অবস্থিত লরেটো আশ্রমের
উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন । সুদীর্ঘ এই যাত্রা তাঁরা শুরু করেছিল ১৯২৮
খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বের মাসের শুরুতে । তারপর ভূমধ্যসাগরের মধ্য দিয়ে তাঁদের
নৌযান সুয়েজ খাল পেরিয়ে লোহিত সাগরে পড়ল । অবশেষে তাঁরা ভারত মহাসাগরে গিয়ে পৌঁছালেন
। যাত্রাপথে তাঁরা কলম্বো ও মাদ্রাজে(বর্তমান চেন্নাই) কিছু সময় বিরতির পর কলকাতায়
গিয়ে পৌছালেন ৬ই জানুয়ারী ১৯২৯ খ্রীষ্টাব্দে । পরবর্তীকালে সিস্টার তেরেজা
লিখেছিলেন “ অবর্ণনীয় আনন্দের সাথে আমরা বাংলার মাটিতে পা রেখেছিলাম ।”
এরপর সিস্টার
তেরেজাকে দার্জিলিংয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হলো । সেখানে তিনি দুই বছর নবিশালয়ে কাটালেন
প্রার্থনা, অধ্যয়ন ও ধর্মব্রতী সিস্টার হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহন করলেন । তাঁকে
সেখানে এদেশের লোকদের ভাষাও শিখতে হলো, অতি সহজে তিনি বাংলা ও হিন্দি ভাষা শিখে
ফেললেন । অবশেষে ঈশ্বরের নিকট তাঁর জীবন সমর্পণের মহাদিনটি এসে হাজির হলো । ১৯৩১ খ্রীষ্টাব্দে ২৫ শে মে তারিখে এক বিশেষ উপাসনা
অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সিস্টার তেরেজা প্রথম সন্ন্যাসব্রত গ্রহন করলেন । ঈশ্বরের
নিকট তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন তিনি দরিদ্রতা ও শুচিতা ও বাধ্যকতার জীবন যাপন করবেন
এবং শিশুদের শিক্ষাদানের কাজে জীবন ব্যয় করবেন । এসব ব্রত ছিল সাময়িক ব্রত, অর্থাৎ
এক বছরের জন্য । এক বছর পার হওয়ার পর তাঁকে ব্রত নবায়ন করতে হলো । ঈশ্বরের নিকট
জীবন উৎসর্গের প্রতিকস্বরূপ তিনি একটি লম্বা কালো জামা (ধর্মীয় পোষাক) এবং মাথা
ঢাকবার জন্য কালো রুমাল পরলেন । এই
দিনটিকে তিনি ‘তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন ’ বলে অভিহিত করেছিলেন, কারণ সেদিন তিনি
পরিপূর্ণরুপে খ্রীষ্টের একান্ত আপনজন হয়ে উঠেছিলেন ।
প্রথম সন্ন্যাসব্রত
গ্রহনের অল্প কিছুদিন পরেই সিস্টার তেরেজাকে কলকাতার লরেটো এন্টালি কনভেন্টে
পাঠিয়ে দেওয়া হয় । সেখানে তিনি সেন্ট মেরীজ বাংলা মাধ্যম স্কুলে ভূগোল ও ধর্ম
বিষয়ক বই পড়াতে শুরু করলেন । শিক্ষিকা হিসেবে তাঁর প্রচুর দক্ষতা ছিল ।
শ্রেণীকক্ষে ছাত্রীদের কড়া শাষন করলেও তিনি অত্যন্ত দয়ালু প্রকৃতির ছিলেন । তাঁর
ছাত্রীরা তাঁকে খুব ভালোবাসত । তাঁর পড়ানোর ধরন ছিল খুব চমৎকার, তাই ছাত্রীরা তাঁর
পড়ানো খুব উপভোগ করত । শরীর চর্চা শিক্ষার সময় তিনি মেয়েদের বিভিন্ন খেলা, যেমন
বাস্কেটবল, বল ছোড়া ও দৌড় প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহনের শিক্ষা দিতেন । খেলার সময়
শিশুদের মধ্যে তর্কবিতর্ক শুরু হলে তিনি মিটমাট করে দিতেন । তাঁদের কাছে ঈশ্বর
সম্বন্ধে কথা বলতে সিস্টার তেরেজা খুব পছন্দ করতেন । তাঁদের তিনি বোঝাতে চেষ্টা
করতেন ঈশ্বর তাঁদের অনেক ভালোবাসেন । ভালোবাসার প্রতিদানে ঈশ্বরের প্রতি তাঁদের
ভালবাসা দেখানোর জন্য তিনি শিশুদের ত্যাগস্বীকারের মুল শিক্ষা দিতেন । তাদের অবসর
সময়ে সিস্টার তেরেজা তাদের কয়কজনকে সংগে নিয়ে বস্তির গরীব লোকদের সাথে দেখা করতে
যেতেন । আর তারা অনেক সময়ই তাদের খাবার কিছুতা গরীব ছেলেমেয়েদের দিয়ে দিত ।
সিস্টার তেরেজা তাঁর আহ্বানকে তিনি মনেপ্রাণে ভালবাসতেন । প্রথম ব্রত গ্রহনের ৬
বছর পরে তাঁর বয়স যখন ২৭ বছর তখন ২৪ শে মে ১৯৩৭ খ্রীষ্টব্দে তিনি চির ব্রত গ্রহন
করেন । এবার তিনি ঈশ্বরের নিকট প্রতিজ্ঞা করলেন জীবনের বাকী সময়টুকু দারিদ্রতা
শুচিতা ও বাধ্যতার ব্রত পালনের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দিবেন । তাঁর জীবনে পেছনে আর ফিরে
যাওয়ার কোন প্রশ্নই ছিল না । তাঁর গোটা জীনটাই ছিল “সম্পুর্ণরুপে একমাত্র যীশুরই
জন্য” । এদিন থেকে তাঁকে আর সিস্টার তেরেজা না বলে “মাদার তেরেজা” বলে ডাকা হয় ।
তিনি স্কুলে
পড়াতে শুরু করলেন এবং ১৯৪৪ খ্রীষ্টাব্দে সেন্ট মেরীজ স্কুলের প্রধান অধ্যক্ষা হলেন
। তাছাড়া তাঁর ওপর লরেটো সংঘের সাথে যুক্ত ভারতীয় সন্নাসব্রতী সিস্টাদের দল, যারা
ডটার্স অফ সেন্ট অ্যান ( সাধধী আন্নার
কন্যাগণ ) নামে পরিচিত, তাদের দেখাশুনার দায়িত্ব দেওয়া হলো । মাদার তেরেজা কঠোর পরিশ্রমী
ছিলেন এবং তাঁর অসাধারন সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল । তাঁর মধ্যে গভীর রসবোধ ছিল । শত
কাজের মধ্যেও তিনি সদাপ্রফুল্ল ও হাসিখুশি থাকতেন । তাঁর মধ্যে বিশাল উদার মন ছিল
। তিনি সব সময়ই অন্যের অভাব ও প্রয়োজন লক্ষ্য করতেন অথচ তাঁর নিজের প্রয়োজনের দিকে
তিনি কোন নজরই দিতেন না । তাঁর সহভগ্নিগণ অবাক হয়ে লক্ষ্য করতেন, তিনি কত দ্রুত
তাঁর কাজ সম্পাদন করতেন । তাঁরা অবশ্য জানতেন না যে , ১৯৪২ খ্রীষ্টাব্দে তিনি একটি
ব্যক্তিগত ব্রত নিয়েছিলেন । ঈশ্বরের নিকট তিনি বিশেষভাবে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে,
ঈশ্বর তাঁর কাছে যা চাইবেন তার কোন কিছুই তাঁকে দিতে তিনি অস্বীকার করবেন না ।
মাদার তেরেজা ঈশ্বরকে এতোই ভালবাসতেন যে, তাঁকে তিনি সব সময়ই এমনকি যখন হ্যাঁ বলা
কষ্টকর হতো তখনও হ্যাঁ বলতেন । আর যথা সম্ভব শিঘ্রই তিনি তাঁর ইচ্ছা পালন করতে
চেষ্টা করতেন ।
লরেটো সংঘের
সন্ন্যাসব্রতী হিসেবে মাদার তেরেজা অত্যন্ত সুখী ছিলেন । তিনি তাঁর সহভগ্নিদের
ভালবাসতেন আর শিশুদের জন্য সকল কাজ করতে পছন্দ করতেন । এভাবে সংঘে যোগ দেওয়ার পর
দেখতে দেখতে সুদীর্ঘ কুড়িটি বছর কেটে গেল- তিনি যেন বুঝতেই পারলেন না কত দ্রুত
সময়টা পার হয়ে গেল । হঠাৎ একদিন অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে গেল । দিনটি ছিল ১০ই
সেপ্টেম্বর ১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দ । মাদার তেরাজার বয়স তখন ৩৬ বছর । তিনি সেদিন রেলপথে
দার্জিলিং যাচ্ছিলেন আট দিনব্যাপী নীরবতা ও প্রার্থনায় বাৎসরিক নির্জন ধ্যান করার জন্য । ট্রেনে থাকার সময় তিনে শুনতে পেলেন
স্বয়ং যীশু তাঁর সাথে কথা বলছেন । তিনি শুনলেন যীশু তাঁকে বলছেন – সবকিছু ত্যাগ
করে দরিদ্রদের মধ্যে গিয়ে তাঁকে অনুসরণ করতে যাদের সম্পদ বলতে কিছু নেই বা আপন
বলতে কেউই নেই, যারা অতি কষ্টে জীবন যাপন করছে, সেই নিঃস্বতমদের মাঝে গিয়ে তাঁর
সেবা করতে । যীশুর মধ্যে ভালবাসা দেবার এবং ভালবাসা পাবার পিপাসা ছিল প্রবল । এ
ছিল এক অদ্ভুত আহ্বান, “একটি আহ্বানের মধ্যে আরেকটি আহ্বান”। মাদার তেরেজা বুঝতেজ পারলেন
স্বয়ং ঈশ্বর তাঁর নিকট এই আহ্বান জানিয়েছেন এবং এটি হবে তাঁরই কাজ । কিভাবে করতে
পারবেন তা বুঝতে পারলেন না, আবার তিনি তাঁকে না বলতেও পারলেন না ।
কলকাতায় ফিরে এসে
মাদার তেরেজা তাঁর আধ্যাত্মিক পরিচালক ফাদার সেলেন্ত ভ্যান আকসেম এস.জে.-কে তাঁর
অনুপ্রেরণার বিষয়টি জানালেন । তিনি তাঁকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে ও প্রার্থনা করতে
বললেন । দীর্ঘ ছয় মাস যাবত মাদার তেরেজা তাঁর অন্তরে যীশুর কথা শুনতে পেলেন । তিনি
তাঁকে বলছিলেন –ঃ “হে আমার প্রিয় ছোট্ট সেবিকা, এসো আমাকে তুমি নিঃস্বদের অন্ধকার
গুহার ভিতরে বহন করে নিয়ে চল । এসো তুমি আমার আলো হও । আমি একা যেতে পারি না –
তাঁর আমাকে চেনে না – তাই তারা আমাকে চায় না ।” একসময় দিব্য দর্শণে তিনি দেখতে পেলেন –ঃঅনেকে অনেক
দরিদ্র মানুষ ও শিশুরা তাঁকে ডেকে বলছে –ঃ “ এসো এসো আমাদের বাঁচাও – আমাদের যীশুর
কাছে নিয়ে চলো ।” সেই সময় তিনি যীশুর মা মারীয়াকেও দেখতে পেলেন । তিনিও তাঁকে
বললেন –ঃ “যীশুকে তুমি ওদের কাছে (গরীবদের কাছে) নিয়ে যাও-ভয় পেয়ো না । ওদের তুমি
রোজারী মালা প্রার্থনা করতে শেখাও-পারিবারিক রোজারী মালা প্রার্থনা-তাহলেই ঠিক হয়ে
যাবে- ভয় পেয়োনা তুমি – যীশু ও আমি তোমার সাথে ও তোমার সন্তানদের সাথে থাকবো । ” যীশুকে মাদার তেরেজা ক্রুশের উপর দেখতে পেলেন
। ক্রুশ থেকে তিনি তাঁকে বারবার অনুরোধ জানিয়ে বলছিলেন তিনি যেন তাঁর আহ্বান
প্রত্যাখ্যান না করেন । যীশু চেয়েছিলেন তিনি যেন ভারতীয় সিস্টারদের নিয়ে ‘মিশনারীজ
অফ চ্যারিটি’ নামে একটি নতু সংঘ শুরু করেন; তাঁরা যেন গরীব মানুষের মাঝে তাঁর ভালোবাসা ও সমবেদনা
ছড়িয়ে দেন । ফাদার ভ্যান একসেম মাদার তেরেজাকে পরামর্শ দিলেন তিনি যেন বিষয়টি নিয়ে
আর্শবিশপের সাথে কথা বলেন । সেই অনুসারে তিনি আর্চবিশপ পেরিয়ের কাছে লিখে জানালেন । তিনি আশা করেছিলেন
তখনই তিনি তাঁর প্রস্তাবে হ্যাঁ বলবেন । কিন্তু তিনি বরং তাঁকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা
করার ও প্রার্থনা করার পরামর্শ দিলেন । মাদার কিন্তু অবিলম্বে শুরু করতে ছেয়েছিলেন
। তাই অপেক্ষা তাঁর পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে দাড়িয়েছিল । তবুও তিনি অনুগত থাকলেন ।
পরিশেষে আর্শবিশপ মহোদয় নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারলেন যে, স্বয়ং ঈশ্বরের কাছ থেকেই
তিনি এই অনুপ্রেরণা পেয়েছেন । তাই লরেটো সংঘে তাঁর কতৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে তিনি
তাঁকে সঙ্ঘের বাইরে গিয়ে এই নতুন সেবাকাজ শুরু করার অনুমতি দিলেন ।
![]() |
| Photo taken - Hilary M. Marak. Mother Theresa House. (Kolkata AJC Bose Road. India) |
১৯৪৮ খ্রীষ্টব্দের আগষ্ট মাসে তেরেজা তাঁর লরেটো সঙ্ঘের কালো পোশাক ছেড়ে দিয়ে
নীল পাড় সাদা সুতির শাড়ি পড়ে লড়েটো আশ্রম ত্যাগ করলেন । এটি ছিল তাঁর কঠিনতম কাজ ।
তাঁর নিজ পরিবারকে ত্যাগ করা যতটা না কষ্টসাধ্য ছিল, তার চাইতে বেশি কষ্টসাধ্য ছিল
লরেটো সঙ্ঘ ত্যাগ করা । লরেটো আশ্রমের সকল সিস্টার ও ছাত্রছাত্রীরা এতে ভীষণ আঘাত
পেলেন । মাদার তেরেজার জীবনে দৈব ঘটনা ও তাঁর ইচ্ছা সম্বন্ধে তাঁর কিছুই জনাতেন না
। তারা তাঁকে শুভাচ্ছা জানিয়ে বিদায় দিলেন বটে কিন্তু তাঁকে হারানোর বেদনা তারা
তীব্রভাবে অনুভব করলেন । তখন মাদারেঁর বয়স হয়েছিল ৩৮ বছর । লরেটো থেকে বিদায় নিয়ে
তিনি প্রথম পাটনা গেলেন । চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে কিছু শিক্ষা নিলেন ।
নার্সিংয়ের
প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষন নিয়ে মাদার তেরেজা ১৯৪৮ খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায়
ফিরে এলেন । তাঁর থাকবার জন্য নিজস্ব কোন জায়গা না থাকাতে তিনি কলকাতায় লিটল
সিস্টার্স অব দ্য পুওর(little sisters
of the Poor) নামক একটি
ক্যাথলিক সন্ন্যাসব্রতী সিস্টার সঙ্ঘের একটি আবাসে থাকতে লাগলেন । তারা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সেবা করতেন । ডিসেম্বর
মাসের ২১ তারিখে মাদার তেরেজা প্রথমবার বাইরে গিয়ে তালতলায় দরিদ্র পরিবার ও
রাস্তায় পড়ে-থাকা গরীবদের সাথে সাক্ষাৎ করতে শুরু করলেন ।পরবর্তী কয়েকদিন তিনি
পানবাগান, মতিঝিল ও তিলজলা বস্তিতে গিয়ে তাঁর সাধ্যমতো গরীবদের কষ্ট লাঘব করতে
চেষ্টা করতেন । বস্তিতে গিয়ে তিনি দারিদ্র্য ও কষ্টের যে চিত্র দেখতে পেলেন তা
ছিলা ভয়ানাক । তিনি অসুস্থদের ক্ষতসমুহ পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন এবং
যতদুর সম্ভব তাদের ওষুধও দিলেন ।তিনি বুঝতে পারলেন যে কষ্টের মাঝে নিমজ্জিত এসব
গরিব মানুষদের সুখী করা যেতো যদি ঈশ্বর আরো বেশী করে এদের জীবনে প্রবেশ করতো । ১৯৪৮
খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ নাগাদ মাদার তেরেজা মতিঝিলে একটি স্কুল
শুরু করলেন । তাঁর প্রথম শ্রণীকক্ষ ছিল একটি গাছতলা এবং ব্ল্যাকবোর্ড হিসেবে
ব্যবহৃত হতো পায়ের তলার মাটি । সেখানকার অসহায় শিশুরা যে স্কুলে যেতে পারছে সে
জন্য তারা খুব খুশী ছিল ।
মাদার তেরেজাকে
তার থাকার জন্য একটি আশ্রয় স্থল খুঁজে বের করতে হলো । জায়গা খুঁজতে গিয়ে হাঁটতে
হাঁটতে তাঁর হাত পা ব্যাথা হয়ে গেল । তিনি ভাবতে শুরু করলেন গরীবরা যখন ঘরবাড়ি,
খাদ্য , পানীয় ও সাহায্যের জন্য হেঁটে বেড়ায়, তখন তাদের না জানি কত কষ্ট হয় । মাদার
তেরেজার পক্ষে একা একা থাকা খুব কষ্টসাধ্য ছিল । তাই তিনি মনে মনে লরটো আশ্রমে
ফিরে যাবার কথা ভাবছিলেনে । কিন্তু
পরমুহুরতেই তাঁর মনে পড়ে গেল ঈশ্বরের নিকট তাঁর প্রতিজ্ঞার কথা । আর তক্ষুনি তিন
তাঁর সাহস ফিরে পেলেন । অবশেষে ১৪ নম্বর ক্রিক লেনে গোমেজ ভ্রাতারদের নিজস্ব একটি বাড়ির উপরতলায় তিনি একটি স্থান
খুঁজে পেলেন । তিনি সেখানে গিয়ে উঠলেন ১৯৪৯ খ্রীষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে ।
মাদার তেরেজা
যীশুর মা মারীয়ার কাছে প্রার্থনা করতে থাকলেন যেন তাঁর এই কাজে যোগ দেওয়ার জন্য
আরো মহিলারা এগিয়ে আসে । ১৯৪৯ খ্রীষ্টব্দের মার্চ মাসে সুবাসিনী দাস এসে যোগ দিলেন
। তিনি সেন্ট মেরীজ স্কুলে তাঁর ছাত্রী ছিলেন । তিনি “সিস্টার
আগ্নেস” নাম নিলেন । এরপর আসলেন ম্যাগডেলিন পল্টা “যিনি সিস্টার গেট্রুড” নামে পরিচিত হলেন । পরবর্তীতে
কয়েক মাসে লরেটো থেকে আরো কয়েকজন মেয়ে এসে এই নতুন সমাজে যোগ দিলেন । ১৯৫০ জুন
মাসে তাদের সংখ্যা হলো ১২ জন । ১৯৫০ খ্রীষ্টাব্দের ৭ ই অক্টোবর তারিখে আর্চবিশপ
পেরিয়ে মহাধর্মপ্রদেশের অধীনে সন্ন্যাস-সংঘ হিসেবে তাদের প্রতিষ্ঠা করলেন । ১৯৫১
খ্রীষ্টব্দে মাদার তেরেজা ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহন করলেন । তাঁর ইচ্ছা ছিল যে জনগণের
তিনি সেবা করবেন তাদের দেশ যেন তাঁর আপন দেশ হয় ।
নিঃস্বদের মধ্যে
নিঃস্ব তমের জন্য কাজের পরিসর বৃদ্ধি পেতে শুরু করলো । মাদার তেরেজা ও তাঁর
সহকর্মীবৃন্দ যীশুর নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর আলো বহন করে দরিদ্র জনগনের “অন্ধকারময়
অসুখী” গৃহে প্রবেশ করে তাদের জীবনে আশা ও আনন্দের ভাব জাগিয়ে তুললেন । সিস্টারগণ প্রচুর উৎসাহ ও উদ্দিপনায় ভরপুর ছিলেন । কোন ত্যাগ স্বীকারকে তাঁরা
খুব বড় কিছু বলে মনে করেন নি । মাদার তেরেজা আরো কয়েকটি কেন্দ্র শুরু করলেন যেখানে
গরীব লোকেরা খাদ্যদ্রব্য ও ঔষুধ পেতে লাগলো । সাথে সাথে বস্তিতে গরীব পরিবারের
ছেলেমেয়েদের জন্য তিনি আরো কিছু স্কুল চালু করলেন ।
মাদার তেরেজার
কাছে প্রতিটি মানুষই ছিলেন যীশু, যদিও মানুষের মাঝে তাঁকে( যীশুকে) চেনা যেতো না ।
তিনি তাঁর সহকর্মী সিস্টাদের মঙ্গলসমাচার থেকে প্রায়ই যীশুর উচ্চারিত কথা গুলো স্মরণ
করিয়ে দিতেন, “আমার
এই ভাইবোনদের জন্য যা-কিছু করেছো তা আমারই জন্য করেছো ।”
১৯৫০
খ্রীষ্টাব্দে কলকাতা শহরের রাস্তাঘাটে হাজার লোক বসবাস করতে শুরু করেছিল এবং
প্রতিদিনই তাদের অনেক লোক মারা যেতো । সিস্টারগণ অনেক সময় রাস্তাঘাটে ও বস্তিতে
এমন অসুস্থ লোকদের দেখা পেতেন যাদের শরীরে থাকতো কীটে ভরা দুর্গন্ধময় পচা ঘা, অনেক
সময় তাদের দেহ থেকে ইঁদুর মাংস খেয়ে ফেলতো । অযত্নে অবহেলায় তারা নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যেতো
। এ অবস্থায় মাদার তেরেজা এমন এক বাড়ির খোঁজ করছিলেন যেখানে তিনি এসব অসুস্থ অসহায়
মুমূর্ষ লোকদের এনে সেবাযত্ন করতে পারেন, যাতে তার মানবিক মর্যাদাসহ চিকিৎসা পেতে
পারে অথবা শান্তিতে মৃত্যু বরণ করে ঈশ্বরের কোলে আশ্রয় নিতে পারে । কলকাতায় সিটি কর্পোরেশন তাঁকে কালীঘাটের
কালীমন্দিরের পাশে তীর্থযাত্রীদের জন্য নির্ধারিত একটি আশ্রয় কেন্দ্র এসব কাজের
জন্য দান করলেন । ১৯৫২ খ্রীষ্টাব্দের ২২শে আগষ্ট তারিখে মাদার তেরেজা কালীঘাটে
মরণোন্মুখ মানুষের জন্য প্রথম গৃহটি উদ্বোধন করে নাম দেন “নির্মল হৃদয়” যার অর্থ
হচ্ছে “বিশুদ্ধ হৃদয়” । সেখানকার একজন রোগী মৃত্যুর আগে বলেছিলেন “আমি রাস্তায়
একজন জানোয়ারের মত জীবন যাপন করেছি, কিন্তু আমি মরতে যাচ্ছি একজন দেবদূতের মত” ।
এই আবাসিক গৃহটি সবসমই মাদার তেরেজার হৃদয় মন্দিরে প্রথম স্থান করে নিয়েছিল । বহু
বছর ধরে তিনি প্রতিদিন সকালে এসে এখানে সেবা কাজ করতেন । পরবর্তী বছরগুলিতে তিনি
কেবল রবিবার সকালে সেখানে যাওয়ার সময় পেতেন । আর এখানে তিনি সর্বদা সবার আগে সবচাইতে ঘৃণ্য বলে বিবেচিত কাজগুলো
নিজের হাতে করতেন । টয়লেট ও নর্দমার আবর্জনা তিনি নিজের হাতে পরিষ্কার করতেন ।
মাদার তেরেজা ও
তাঁর সিস্টারগণ বস্তি পরিদর্শনের সময় এমন অনেক শিশু দেখতে পেতেন যারা ছিল
পুষ্টিহীনতার স্বীকার
কেননা তাদের
মা-বাবারা ছিলো নিতান্ত গরিব । তাদের ঘরে যথেষ্ঠ খাবার থাকতো না । ছোটদের এরুপ
দুর্দশা দেখে তাদের যত্ন নেবার জন্য মাদার তেরেজা শিশুভবন প্রতিষ্ঠা করলেন ।
পরবর্তীকালে তিনি কুষ্ঠরোগীদের সেবাযত্ন নেবার জন্য একটি কেন্দ্র চালু করলেন । যেখানে
রোগীরা চিকিৎসা ও সেবাযত্ন পেত । ১৯৫৩ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ সিস্টাদের সংখ্যা এতোই
বেড়ে গেল যে ১৪ নম্বর ক্রিক লেনে তখন আর জায়গার সংকুলান হচ্ছিল না । অনেক প্রার্থনা করার পর মাদার তেরেজা ৫৪ এ লেয়ার
সার্কুলার রোডে অপেক্ষাকৃত এক বড় বাড়ির সন্ধান পেলেন ( পরবর্তীতে যে রাস্তার নাম
রাখ হয়েছে এ.জে.সি. বোস রোড) ১৯৫৩ খ্রীষ্টব্দে ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি তাঁর
সিস্টারগণ এই বাড়ীতেই থাকতে শুরু করলেন ।
১৯৫৯ খ্রীষ্টব্দে
মে মাসে তিনি একদল সিস্টারকে সংগে নিয়ে রাঁচি গিয়ে সেখানে একটি আশ্রম গৃহ শুরু
করলেন, এরপর থেহে ক্রমান্বয়ে দিল্লী, বোম্বাই ও ঝাঁসিতে তিনি আশ্রমগৃহ খুললেন । এরপর
সার ভারত বর্ষেই তিনি আশ্রমগৃহ খুললেন । ১৯৬৫ খ্রীষ্টাব্দে ১লা ফেব্রুয়ারী তারিখে
এই নতুন সঙ্ঘটি সরাসরি পোপ মহোদয়ের অধীনে এল । তখন থেকেই মাদার তেরেজা অন্য দেশেও
তাঁর সেবা কাজের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে পারলেন । ভারত বর্ষের বাইরে তাঁর সেবাকাজের
প্রথম ক্ষেত্র ছিল ভেনেজুয়েলা । শুরু হয়েছিল ১৯৬৫ খ্রীষ্টাব্দের জুলাই মাসে । এরপর
অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর সেবাকাজ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়লো ।
মাদার তেরেজার
কাজের পরিধি অতি দ্রুত বিস্তার লাভ করতে লাগলো । একে তুলনা করা যায় পুকুরের জলে
ক্ষুদ্র নুড়ি পাথার নিক্ষেপ করার সাথে । পাথরটি জলে পরাতেই সেখানে একটি বৃত্ত তৈরি
হয়, একে একে আরো অনেক বৃত্ত তৈর হয়ে ক্রমে তা বৃহত আকার ধারন করে চারিদিকে ছড়িয়ে
পড়তে থাকে । তিনি একা ক্ষুদ্রাকার কাজটি শুরু করেছিলেন বটে, কিন্তু অল্প
কিছুদিন যেতে না যেতেই শুধুমাত্র ভারতবর্ষ থেকেই নয় বরং গোটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ
থেকে মেয়েরা এসে তাঁর সংঘের কাজে, নিঃস্বদের মধ্যে নিঃস্ব তম মানুষদের মধ্যে
যীশুকে সেবা করার কাজে যোগ দিলেন । এসব দেখে যুবকরাও তাঁর প্রম্পূর্ণ সেবাকাজে
অংশগ্রহন করার ইচ্ছা প্রকাশ করলো । এভাবে ১৯৬৩ খ্রীষ্টাব্দে মিশনারীজ অব চ্যারিটি
ব্রাদার শাখা গড়ে উঠলো । ১৯৭৬ খ্রীষ্টাব্দে ধ্যানমার্গী সন্ন্যাসব্রতী সিস্টার
শাখা এবং ১৯৭৯ খ্রীষ্টাব্দে ধ্যানমার্গী সন্ন্যাসমার্গী ব্রাদার শাখা গড়ে উঠলো । এর
সদস্যগণ দরিদ্রদের জন্য অধিক সময় প্রার্থনায় ব্যায় করেন । তারপর যাযকদের নিয়ে
মিশনারিজ অব চ্যারিটি পু্রোহিত শাখা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৪ খ্রীষ্টাব্দে । ইতিমধ্যে ১৯৬৯
খ্রীষ্টাব্দে তেরেজার কাজে আকৃষ্ট হয়ে সকল জাতি ও ধর্মের মানুষ এসে মাদারের সাথে
গরীবদের সেবা করার আনন্দ আস্বাদন করতে শুরু করলেন । এভাবে গড়ে উঠলো মাদার তেরেজার সহযোগী কর্মীদল । এরপর
মাদার তেরেজা রুগণ-পীড়িত ও দুঃখকষ্টে জর্জরিত মানুষদের আহ্বান জানালেন
প্রার্থনাসেবী হয়ে ও নিজেদের কষ্ট উৎসর্গ করার মধ্য দিয়ে তাঁর সিস্টারদের ও তাদের
প্রেরণ কাজে সহায়তা করতেন । এভাবে কলকাতা থেকে শুরু করে প্রথমে গোটা ভারত বর্ষে
এবং তারপর বিশ্বের ১২০ টিরও বেশি দেশে তাঁর কর্মক্ষেত্র বিস্তার লাভ করলো ।
মাদার তেরেজার
সেবার কাজ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো । ফলে তাঁকে অনেক নামী-দামী পুরষ্কারে ভূষিত
করা হলো । তার মধ্যে প্রথমটি ছিল ১৯৬২
খ্রীষ্টাব্দে প্রদত্ত পদ্মশ্রী পুরষ্কার । এরপর ১৯৭২ খ্রীষ্টাব্দে তাঁকে দেওয়া হলো
জহরলাল নেহেরূ পুরষ্কার এবং ১৯৮০ খ্রীষ্টাব্দে ভারতরত্ন পুরষ্কার । যে পুরষ্কারটির
মাধ্যমে গোটা বিশ্বের মানুষের দৃষ্টি তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল তা হলো নোবেল
শান্তি পুরস্কার । এই পুরষ্কার তাঁকে দেওয়া হয়েছিল ১৯৭৯ খ্রীষ্টাব্দের ১০ই
ডিসেম্বর তারিখে, নরওয়ে আসলোতে । তিনি এই পুরষ্কারটি ও অন্যান্য পুরস্কার (তাঁর
জীবন কালে ৭০০-এরও বেশী) ও সন্মান গ্রহন করেছিলেন নিজের নামে নয়, গরীবদের নামে । বিভিন্ন
সংস্থা ও সংগঠন তাঁকে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করলো । কিন্তু
মাদার তেরেজা বক্তৃতা দিতে মোটেই পছন্দ করতেন না । কিন্তু তিনি ভাবলেন তাঁর
বক্তব্য দেওয়ার ফলে মানুষ যদি ঈশ্বরের নৈকট্য লাভ করে এবং তাদের নিজস্ব এলাকায়
গরীবদের অবস্থা সম্বন্ধে অধিকতর সংবেদনশীল
হয় তবে তিনি তা করতে রাজি আছেন । এ সময় তাঁকে প্রায়ই কলকাতার বাইরে থাকতে হতো । ঈশ্বরের
ভালোবাসা ও দয়ার বার্তা সকল দেশের জনগনের নিকট বয়ে নিয়ে যেতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন
। তিনি অবশ্য মাতৃ গৃহ থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করতেন না এবং সব সময় সেখানে ফিরে আসার জন্য উদগ্রীব
থাকতেন ।
মাদার তেরেজার
বয়স যখন ৭৩ বছর তখন একদিন ভোরে তিনি তাঁর বিছানা থেকে ওঠার সময় পড়ে গিয়ে আঘাত পান
। এই ঘটনা ঘটে ১৯৮৩ খ্রীষ্টাব্দে, যখন তিনি রোম নগরীতে তাঁর ভগ্নীদের কাজ পরিদর্শন
করতে গিয়েছিলেন । আঘাত পাওয়ার পর তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে
পরীক্ষার সময় ডক্তারা দেখতে পান যে তাঁর হৃদপিণ্ডে গুরুতর সমস্যা আছে । তাঁকে অনেক
ঔষধপত্র দেওয়া সত্ত্বেও পরবর্তী কয়েক বছর তাঁর বেশ কয়েকবার হার্ট অ্যাটাক হলো এবং
অবশেষে তাঁর হৃদপিণ্ডে পেসমেকার যন্ত্র বসানো হলো । তা সত্ত্বেও তিনি কাজ করা থেকে
বিরত থাকেন নি । যীশুকে তিনি কোনমতেই না বলেন নি । একটু সুস্থ বোধ করলেই তিনি আবার
বেরিয়ে পরতেন এবং নতুন নতুন জায়গায় আশ্রম ও সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতেন এখানে
সেখানে বক্তৃতা দিতেন, তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে ঈশ্বরের ভালোবাসা, আনন্দ ও
শান্তির বাণী জনগণের নিকট প্রচার করার সুযোগ কখনই তিনি হারাতেন না । তিনি নিজের
বিষয় কখোনই কিছুই ভাবতেন না । যখনি তিনি শুনতে পেতেন যে, পৃথিবীর কোথাও
রোগে-ব্যাধিতে আক্তান্ত,যুদ্ধ, ভুমিকম্প, বন্যা বা দুর্ভিক্ষের শিকার হয়েছে তখনি
তিনি সাহায্য করতে এগিয়ে যেতেন । তিনি মানুষের বর্ণ, ধর্ম ও জাতীয়তা
বাছবিচার না করে সবাইকে ঈশ্বরের সন্তান হিসাবে এবং তাঁর আপন ভাই বা বোন হিসেবে
দেখতেন । যে কোন মানু্ষ তাকে দেখলেই বুঝতে পারতো যে, সে একজন ধার্মিক ব্যক্তির
ব্যক্তির সান্নিধ্যে আছে । তার বুঝতে পারতো যে তিনি ঈশ্বরের অনেক ঘনিষ্ঠজন ।
মাদার তেরেজা
সম্বন্ধে এমন কিছু তথ্য আছে যা সিস্টারগণ বা জনসাধারণ কখনো জনতে পারেন নি । তার
শরীরে যে অসহনীয় ব্যাথা ছিল তা তারা জানতেন না । তিনি ঈশ্বরকে সমস্ত মনপ্রান দিয়ে
ও সমস্ত শক্তি দিয়ে ভালোবাসতেন এবং তাঁর প্রতি ঈশ্বরের গভীর ভালোবাসা উপলব্ধি
করতেন । কিন্তু এরসবই বলদে গেল তিনি যখনই গরীবদের মাঝে কাজ করতে শুরু করলেন তখনি
তাঁর মনে হলো যেন ঈশ্বরের সাথে তাঁর আগের সেই ঘনিষ্ঠতা আর নেই, যদিও তিনি ঈশ্বরকে আগের মতোই ভালবাসতেন । অনেক বছর ধরে তিনি অনুভব করলেন যে, ঈশ্বর তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন ঈশ্বর আর তাঁকে
চিনেন না, এমনকি ঈশ্বর তাঁকে আর বিন্দু মাত্র ভালবাসেন না । কিন্তু তিনি তো অবশ্যই
তাঁকে ভালবাসতেন । ঈশ্বর তাঁর কাছে থেকে তাঁর উপস্থিতি লুকিয়ে রেখেছিলেন । তিনি
তাঁকে বুঝিয়ে দিতে চাইলেন তাঁর কষ্ট-যন্ত্রণা । এই যন্ত্রণা ঈশ্বর পেয়েছিলেন
যখন তিনি ক্রশের উপর মৃত্যুবরণ করেছিলেন এই যন্ত্রণা শত সহস্র দরিদ্র মানুষ
উপলব্ধি করে – যারা নিঃসঙ্গ যারা অনাদৃত ও যারা ভালবাসা থেকে বঞ্চিত । তাই
তিনি দরিদ্র মানুষের কষ্টের কথা এতো ভালো করে বুঝেছিলেন । মাদার তেরেজা এসব
অনুভূতিকে প্রশ্রয় না দিয়ে প্রার্থনা করতে থাকলেন, ঈশ্বরকে ভালবাসতে ও সেবা করতে
থাকলেন । তিনি এবং তাঁর সন্ন্যাসব্রতী পরিবার গরীবদের ভালোবেসে ও সেবা করে চললেন ।
তাঁর মুখের হাসি দেখে কেঊ অনুমান পর্যন্ত করতে পারেনি যে তাঁর অন্তরে অনুভূতি কি
ছিল । যীশু কিন্তু সব সময় তাঁর অতি নিকট থেকে তাঁকে শক্তি যোগাচ্ছিলেন এবং তাঁর মধ্য
দিয়ে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছিলেন ।
মাদার তেরেজার
বয়স যতই বাড়তে লাগলো তাঁর সাস্থ্যের ততই অবনতি হতে থাকলো । তিনি চাইছিলেন যে অন্য
একজন সিস্টার মিশনারিজ অব চ্যারিটি সঙ্ঘের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন । ১৯৯৭
খ্রীষ্টাব্দে ১৩ মার্চ তারিখে সিস্টার নির্মলা এম.সি. সংগের অধ্যক্ষা হিসেবে তাঁর
উত্তরসূরী নির্বাচিত হন । এতে মাদার তেরেজা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে সিস্টার নির্মলা কে
আশীর্বাদ করলেন । তিনি তাঁকে এত বড় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিলেন তার জন্য তাঁকে কৃতজ্ঞতা
জানালেন । এর অনধিক ছয় মাস পরে, ১৯৯৭ খ্রীষ্টাব্দের ৫ ই সেপ্টেম্বর তারিখে রাত
৯.৩০ মিনিটে মাদার তেরেজার মাতৃগৃহে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে “ঈশ্বরের নিকট
চিরস্থায়ী আবাসে” চলে গেলেন । মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর । মুহূর্তের মধ্যে তাঁর মৃত্যু-সংবাদ দ্রুত সারা ভারতে ও গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো
। তাঁর মরদেহ প্রদর্শনের জন্য সেন্ট টমাস গির্জায় রাখা হলো । সেখানে হাজার হজার
লোক ছুটে এলো এই বিনম্র সেবিকার প্রতি তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করার জন্য । কত অগণিত
মানুষের জীবনকে যে তিনি স্পর্শ করেছিলেন তা বলে শেষ করা যাবে না । ভারত সরকার
রাষ্ট্রিয় মর্যাদায় তাঁকে সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা করলেন ১৯৯৭ খ্রীষ্টাব্দে ১৩
সেপ্টেম্বর তারিখে । পশ্চিমবাংলার কলকাতা শরহরবাসীর সাথে গোটা ভারতের অন্যান্য
স্থান থেকে আগত জনগণ এবং ভরতবর্ষ ও বিশ্বের চতুর্দিক থেকে আগত সন্মানিত পদে
অধিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গ যারা তাঁকে ভালবেসেছিলেনে, যারা তাঁর গুণমুগ্ধ ছিলেনে এবং যারা তাঁর সেবাদায়িত্বের মহত্ত্ব স্বীকার
করতেন তাঁরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করার জন্য সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন ।
দরিদ্র মানুষেরা এবং মিশরনারীজ অব চ্যারিটি পরিবার তাদের অতি প্রিয় মাকে হারনোর
জন্য তীব্র বেদনা অনুভব করলো । তাঁর মরদেহ মতৃগৃহে রাখা হলো । সেই গৃহ সত্ত্বর এক
তীর্থস্থানে পরিণত হলো । তাঁর সমাধির উপর প্রস্তর ফলকে খোদাই করে লেখা রইল যীশুর
এই কথাগুলোঃ “আমি যেমন তোমাদের ভালোবেসেছি,তোমরাও তেমনি পরস্পরকে ভালোবাসবে । ”
মাদার তেরেজা জীবনভর তাই করেছিলেন ।
প্রতিদিন বিশ্বের
বিভিন্ন জয়গা থেকে লোকজন আসে মাদার তেরেজার সমাধি-স্থানে প্রার্থনা করার জন্য ।
তিনি আজও তাদের জীবনে ঈশ্বরের উপস্থিতি নিয়ে আসছেন এবং তাদের নিকট তাঁর আলো ও তাঁর
ভালোবাসার দীপ্তি ছড়িয়ে দিচ্ছেন । শতসহস্র মানুষ তাকে স্বর্গনিবাসী বন্ধু হিসেবে
পেয়েছে যার কাছে তাঁদের প্রয়োজন ও অভাব তাঁরা জানতে পারে । তিনি স্বাভাবিক ভাবেই
তাঁদের প্রার্থনা পূরণ করেন । তাঁর নিকট প্রার্থনা করে অনেকেই দুরারোগ্য ব্যাধি
থেকে মুক্তিলাভ করেছে । হতাশাগ্রস্ত
মানুষ নতুন করে আশা, শান্তি ও শক্তি ফিরে পেয়েছে । যারা কীভাবে প্রার্থনা করতে হয়
তা জনতো না তারাও ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করতে শিখেছে । যেসব পরিবারে সঙ্কট দেখা
দিয়েছিল তাঁরা পরস্পরকে ক্ষমা করতে ও নতুন করে পরস্পরকে ভালোবাসতে শিখেছে । যে
দম্পতির বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল তারা নতুন করে সমৃদ্ধ ভালোবাসার বন্ধনে
সঞ্জিবিত হয়ে উঠেছে । অনেকেই স্বার্থপর জীবন যাপন করার চেয়ে বরং অপরের জন্য জীবন
যাপন করার সুষমা ও আনন্দ আবিষ্কার করেছে । অনেকেই পবিত্রতায় বেড়ে ওঠার জন্য সাধনা করতে, হাসিমুখে ঈশ্বরের ইচ্ছা পালন
করতে অনুপ্রাণিত হয়েছে ।
পোপ সাধু জনপল ১৯
শে অক্টোবর ২০০৩ খ্রীষ্টাব্দে রোম নগরীতে মাদার তেরেজাকে “স্বর্গধন্যা” বলে ঘোষণা
করেন । গত ৪ঠা সেপ্টেম্বর ২০১৬
খ্রীষ্টাব্দে পোপ ফ্রান্সিস রোম নগরীতে মাদার তেরেজাকে কলকাতার সাদ্ধী তেরেজা
আখ্যায় ভূষিত করেছেন । আজও শিশু, গরীব মানুষ, তাঁর প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় পরিবারের
সদস্যগণ এবং অন্যান্য যারা তাঁকে চিনতো ভালোবাসতো এবং যারা তাঁর কাছে প্রার্থনা
করে তাঁদের কাছে তিনি “মা” হিসেবে পরিচিত ।
##//কপিরাইটঃ মিশনারিজ
অফ চ্যারিটি //##


Post a Comment