আমার উত্তরটি একটু লম্বা হবে। একান্তই আগ্রহ না থাকলে পড়ার দরকার নেই।
বাংলাদেশ বা পাকিস্তান দুই দেশের চেয়েই ভারতের উচ্চশিক্ষা অনেক বেশি উন্নত।
প্রশ্নকর্তা যেহেতু ভারতকে উল্লেখ করেননি সেহেতু ভারতের কথা বাদ দিচ্ছি।
বাংলাদেশের চাইতে পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা উন্নত কেন?
এটার মূলে তিনটি কারণ রয়েছে। যেগুলো আমি নিচে বর্ণনা করছি।
১) নিজেদের উচ্চশিক্ষার বিষয়টিতে বাংলাদেশের চাইতে পাকিস্তানের বিনিয়োগ অনেক অনেক বেশি, পাকিস্তানি শিক্ষা কর্মকর্তারা অনেক বেশি আন্তরিক আর পাকিস্তানে আছে HEC (Higher
Education Council)(Home) এর মত সংগঠন।
HEC এর একটু পরিচিতি দেই। এটা সম্বন্ধে আমি জানতে পারি এক পাকিস্তানি ভাই এর কাছে।ভাই আর ভাবী তুরস্কে PhD করছিলেন। আমি ওনাদের বাসায় দেশী খাবার খেতে বেশ কয়েকবার গিয়েছিলাম, এতে তাঁদের সাথে আমার সখ্যতা গড়ে ওঠে। তো একদিন আমি ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম যে পিএইচডি শেষে কী করবেন, পাকিস্তানে ফেরত গিয়ে ঝামেলা করার চেয়ে তুরস্কে থেকে গেলেই ভালো হবে ইত্যাদি পরামর্শ দিতে লাগলাম। তিনি বললেন যে ঝামেলা কিসের। আমাদের HEC আছে। ওরাই আমাদেরকে চাকরী খোঁজে দিবে ।
HEC কে PhD সহ বিদেশে অর্জিত যাবতীয় সনদপত্র জমা দিতে হয়। তারপর ওরা এই সনদপত্রগুলোর সত্যতা যাচাই করে। নকল না হলে আপনাকে আপনার সনদের যোগ্যতা অনুযায়ী বিভিন্ন সরকারী কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে প্রভাষক বা প্রশিক্ষক হিসেবে বেশ সম্মানজনক বেতনে চাকরী পাইয়ে দেয়।
আমাদের দেশে এরকম HEC এর মত কোনো সংগঠন থাকলে অনেকেই দেশে ফিরে যেতে আগ্রহী হতেন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে দুইজন বাংলাদেশী লোককে চিনি, একজন বর্তমানে টার্কিশ আরেকজন ইউক্রেনীয়, যারা ওনাদের পড়া শেষ করে দেশে গিয়ে ওনাদের সনদগুলো সত্যায়িত করার চেষ্টা করেছিলেন। কেবল চেষ্টা না, সম্ভাব্য সকল তদবীরও করেছিলেন। কিন্তু কোনো লাভ হয় নি। দেশের ওসব কর্মকর্তারা ওনাদের সনদগুলো "আমরা এসব চিনিনা" বলে গ্রাহ্যই করেন নি। তো লোক দুটি তুরস্কে আর ইউক্রেনে ফেরত চলে যান এবং এই দুইটি দেশের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান।
বাংলাদেশের একজন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিং এর এই করুণ দশা নিয়ে। তো তিনি বললেন ওনার চাচাতো ভাই লন্ডনের কিংস কলেজ এর একজন পূর্ণ অধ্যাপক। চাচাতো ভাইটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ইমেইল পাঠিয়েছিলেন এই বলে যে "তিনি কয়েকমাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে চান, কোনো বেতন নিবেন না কেবল ওনার একার থাকার জন্য একটু ব্যবস্থা করে দিতে পারলে ভালো হয়"। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই ইমেইলটির কোনো প্রতিউত্তরই করেন নি।
আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আরেকটি বড় সমস্যা হলো আন্তর্জাতিক Collaboration (সহযোগী কর্ম) এর অভাব। দুর্নীতির এক নির্মম চিত্র ফুটে ওঠে এখানে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতে সরকারি খরচে হাঙ্গেরী থেকে ঘুরে আসেন, কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী হাঙ্গেরীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে বদলি ছাত্র (exchange
student) পাঠাতে হবে তা আর করেন না । শেষে হাঙ্গেরী বাধ্য হয়ে নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বদলি ছাত্র নেয়।
বাংলাদেশে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তুরস্কে কাজ করতে চান তাঁদেরকে তুরস্কের কর্তৃপক্ষ থেকে নিজেদের সনদগুলো সত্যায়িত করাতে হয়।তো আমার এক বড় ভাই গেলেন তাঁর সনদগুলোর equivalence
(সমমানপত্র) নিতে। উনি বাংলাদেশী শুনেই কর্মকর্তারা বললো যে "তোমাদের বাংলাদেশী মন্ত্রণালয় তো ছয় মাসেও ইমেইলের প্রতিউত্তর দেয় না, তোমাদের সনদ আমরা কীভাবে সত্যায়িত করব!"।
গত ২০১৭ এর শেষ এবং ২০১৮ এর শুরুর দিকে বাংলাদেশী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এর সাথে আমাকে যোগাযোগ করতে হয়েছিলো। ERASMUS+
ICM নামে একটি প্রকল্পের আওতায় আমার বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ থেকে দুইজন exchange
student আনতে চেয়েছিলো,এবং একবার আনার চুক্তি হয়ে গেলে প্রতিবারই ছাত্র আসার প্রক্রিয়াটি চালু থাকত। তাঁদের প্রত্যেককেই ছয়মাসের জন্য মাসিক ৮০০ ইউরো করে দেওয়া হতো।
তো এই প্রকল্পটির জন্য যোগাযোগ করতে গিয়ে বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু করুণ বাস্তবতা আমার চোখে আসে। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অফিস বা কর্মকর্তা নেই। চারিদিকে কেবল স্বজনপ্রীতির ছড়াছড়ি। দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পড়েছেন বা পড়ছেন এমন কিছু মানুষ আমাকে জানান যে ওসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা যদি নিজেদের ভাই ব্রাদারদের পাঠাতে না পারেন তাহলে তাঁরা এসব প্রকল্প নিয়ে একদমই মাথা ঘামান না । একমাত্র চট্টগ্রামের Asian
University for Women ছাড়া আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায় নি । পরে প্রকল্পটি আর তার বাস্তবরূপ দেখতে পায় না, কারণ deadline (শেষ তারিখ) শেষ হয়ে গিয়েছিলো।
বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য নাম করা অধ্যাপিকা প্রায় বছরখানেক আগে Plagiarism
(লেখাচুরি, কুম্ভীলকবৃত্তি) করে ধরা খেয়েছেন। যে গবেষণাপত্রটিকে তিনি তাঁর নিজের বলে দাবি করেছেন সেটির ৯৫% ছিল নকল করা, অর্থাৎ হালকা এডিট (
সম্পাদনা) করেও ধরা পড়ে গিয়েছেন।
আমার এলাকার একটি সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এর দুইজন অধ্যাপক সম্প্রতি একই গবেষণাপত্র দুইটি আলাদা আলাদা science
journal ( বৈজ্ঞানিক পত্রিকায়) এ নিজেদের নামে ছাপিয়ে ধরা খেয়েছেন। একই মৌলিক গবেষণাপত্র, অথচ এক জায়গায় লেখকের নাম অমুক, অন্য জায়গায় লেখকের নাম তমুক।
এত শত শত ঝামেলার পরও সর্বোত্তম ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় পাকিস্তানের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় এর বিপরীতে বাংলাদেশের যে দুইটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে এটাই ঢের।
পাকিস্তান
বাংলাদেশ
২) পাকিস্তানি সেনাবাহিনী উচ্চশিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতায় যেরূপ তৎপর বাংলাদেশের সেনাবাহিনী সেরূপ তৎপর না। NUST (National University
of Science and Technology) পাকিস্তানের অন্যতম ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়। এটাতে ভর্তি হওয়া বেশ কঠিন। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির র্যাংকিং তাক লাগানো। ১৯৯১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান পাকিস্তানে দ্বিতীয় আর পুরো বিশ্বে ৪১৭।
অপরদিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দ্বারা ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত MIST (Military Institute
of Science and Technology) বা এটার মূল প্রতিষ্ঠান BUP (Bangladesh University
of Professionals) এর র্যাংকিং খোঁজার জন্য বাটি চালান দিতে হয়। বিশ্ব র্যাংকিং তো বহুদূরে, বাংলাদেশের স্থানীয় র্যাংকিং এর সর্বোত্তম ২০ এর মধ্যেও স্থান হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়টির।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এর পক্ষ থেকে আরও ভালোভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করলে MIST ও একদিন অনেক সুনাম কুড়াবে।
৩) পাকিস্তানী ধনকুবেররা যেভাবে পাকিস্তানী শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ করছেন বা অবদান রাখছেন, বাংলাদেশে কিন্তু এরকমটি দেখা যায়নি। বাংলাদেশের অতি পরিচিত ধনকুবের যেমন বসুন্ধরা গ্রুপ বা যমুনা গ্রুপের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকাল কলেজ নেই।
অপরদিকে পাকিস্তানের সবচেয়ে ভালো প্রাইভেট মেডিকাল কলেজ হচ্ছে আগা খান মেডিকাল কলেজ।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো LUMS (Lahore University of
Management Sciences) প্রতিষ্ঠা করেছেন Nestlé
Pakistan Limited এর প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ বাবর আলী। এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থানও বেশ ভালো।
৫০ বছরের কম সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় সর্বোত্তম ১৫০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান করে নিয়েছে।
ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুণগান গেয়ে লিখলে এরকম আরও কয়েকগুণ লম্বা লিখা হবে।
সূত্রঃ
সংগ্রহ করা লেখা collected writing.
إرسال تعليق